বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক সুতোয় গাঁথা

 নিজস্ব প্রতিবেদক

আপডেট: ২০২১-০৩-১৮



বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক সুতোয় গাঁথা

আমিনুল ইসলাম
বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) শ্রেষ্ঠতম বাঙ্গালি। গণতান্ত্রিক মূল্যচেতনা, শোষণ মুক্তির আকাক্সক্ষা এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এই ত্রৈমাত্রিক বৈশিষ্টই বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদী ভাবনার মূলকথা।
বাংলাদেশের কথা বলতে গেলেই অনিবার্য ভাবে এসে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। দেশের স্বার্থের কাছে, জনগনের স্বার্থের কাছে তিনি নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন। এ কারনেই তিনি হয়েছেন বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের ইতিহাস।
তার জীবন ও কর্মের ক্রমিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা আন্দোলনের একটা সময় খন্ডের কথা আমরা জানতে পারি। পাকিস্তান উপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খল থেকে তিনি বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করতে চেয়েছেন, চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে। এই মুক্তির সংগ্রামকে তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে জনগণের পক্ষে দাড়িয়েছেন। শিশু থেকে কিশোর পর্যন্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারন করেছেন প্রতিবাদ। সর্বদা বলেছেন সত্য ও ন্যায়ের কথা এবং এভাবেই হয়ে উঠেছেন স্বাধীনতার মৃত প্রতীক। ভীত ও অত্যাচারের মুখে সর্বদা তিনি বলেছেন শোষিত মানুষের অধিকারের কথা।
শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এই নির্ভীক অবস্থানের কারণে তিনি কেবল বাংলাদেশেই নয়, শোষিত নির্যাতিত বিশ্ব মানব সমাজের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃত পেয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত আলজিয়ার্সের জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের কথাই সেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, বিশ্ব আজ দুই ভাবে বিভক্ত, শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, জাতিসংঘ সাধারন পরিষদের অধিবেশন এইসব স্থানে শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়। বিশ্বের শোষিত মানুষ, বাঙ্গালী, বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নেয় নিজেদের নেতা হিসেবে।
এই কারনেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরম মিত্র ইন্দিরা গান্ধী বলেন, শেখ মুজিব ছিলেন একজন মহান নেতা, তার অদম্য সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগনের জন্য প্রেরনাদায়ক ছিল। কিংবা ফ্রিদেল কাস্ত্রের মতো বিশ্বনেতা বলেছিলেন, আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি, ব্যাক্তিত্ব এবং সাহসিকতায় তিনিই হিমালয়। ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারালো তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃতিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে। বিশ্ব ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর মতো জাতীয়তাবাদি নেতার দৃষ্টান্ত বিরল। তিনি বিশ্বে একমাত্র নেতা, যিনি জাতীয় পুজির আত্মবিকাশের আকাক্সক্ষা ও বাঙ্গালীর স্মমিলিত মুক্তির বাসনাকে এক বিন্দুতে মেলাতে পেরেছেন। এ কারনেই তিনি বাঙ্গালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা। সবার স্বপ্নকে তিনি একটি গ্রহণযোগ্য বিন্দুতে মিলিয়েছেন। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা। বাঙ্গালী আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান। কিশোর কাল থেকেই তিনি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে ছিলেন সোচ্চার। ৪৮ ও ৫২ এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৫৮ এর সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, ৭১ এর গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ বাঙ্গালীর প্রতিটা আওন্দোলনেই তিনি পালন করেন নেতৃত্বের ভূমিকা। বাঙ্গালী স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান শক্তির উৎস ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণ জাতিকে জাগ্রত করেছে। সবাইকে করে তুলেছে স্বাধীনতা মুখী এমন ঘটনা বিশ্বে বিরল। হাজার বছরের অপেক্ষার শেষে ৭ই মার্চের ভাষণ উদ্ভুদ্ধ করেছে স্বাধীনতার স্বপ্নে, মুক্তির সংগ্রামে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এই সূত্রে অনন্য, অতুলনীয়, ঐতিহাসিক। এ ভাষন ছিল একটি জাতি, রাষ্ট্র নির্মানের মৌন শক্তি ও রাজনৈতিক দর্শন। প্রসঙ্গত আমরা পেট্রিক হেনরি, আব্রাহাম লিংকন, উইন্সটন চার্চিল, মার্টিন লুথার কিং- এর ভাষণের কথা বলতে পারি। এ চার জনের ভাষণ বিশ্ব ইতিহাসে অসামান্য গৌরবোজ্জল ছিল। পেট্রিক হেনরি বলেছিল, ‘Give me liberty or give me death (1775)’। উইনস্টন চার্চিল বলেছিল, We shall fight on the beaches, we shall fight on the landing grounds, we shall fight in the fields and in the streets, we shall fight in the hills; we shall never surrender (1940)। আব্রাহাম লিংকন বলেছিল ‘Government of the people, by the people, for the people, shall not perish the earth (1963)’। মার্টিন লুথার কিং বলেছিল ‘I have a dream that my four little children will one day live in a nation where they will not be judged by the color of their skin, but by the content of their character (1963)। চতুষ্ঠীয় মানুষকে জাগ্রত করেছে কিন্তু জাতি রাষ্ট্র সৃষ্টি করেনি। পেট্রিক হেনরি ভাষণ দিয়েছিলেন বিপ্লবী যুদ্ধের জন্য, ভার্জিনীয় সেনা সরবরাহের জন্য। আব্রাহাম লিংকন ভাষণ দিয়েছিল আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সালে অক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে মিত্র বাহিনীর কাছে বৃটিশ নাগরিকদের যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য উনস্টন চার্চিল ভাষণে জানান। মার্টিন লুথার কিং এর ভাষণে ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল স্বাধীনতার ডাক, মুক্তির আহ্বান। একটি স্বাধীন জাতি, রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা। ১৯৭১ সালে ২৬ই মার্চে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনার ডাক দেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। দীর্ঘ নয় মাসের সেই মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন আমাদের প্রধান শক্তির উৎস। তার ডাকে সাড়া দিয়ে দীর্ঘ নয়মাসের যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি আকাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের ধারায় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কবির ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে -
যতকাল রবে পদ্মা, যমুনা, গৌরী, মেঘনা, বহমান,
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের অনন্য স্থপতি। উপনিবেশ-শৃঙ্খলিত একটি ঘুমন্ত জাতিকে জাগ্রত করেছেন, তাদের করে তুলেছেন স্বপ্নমূখী, রক্তমূখী, মুক্তিমূখী। জাতির মানস প্রকল্পকে জাগিয়ে তোলা এটাই হলো বঙ্গবন্ধুর অক্ষয় অবদান। উপনিবেশিক অবকাঠামোর মধ্যে তার মত জাতীয়তাবাদী নেতার জাগরণ রীতিমত বিস্ময়কর।
বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, বাঙ্গালী জাতি এক সুতোয় গাঁথা- একটি অপরটির পরিপূরক, পরষ্পর একাত্মা।
১৯৭১ সালের ২৫ই মার্চ দিবাগত রাত ১২.২০ মিনিটে তিনি স্বাধীনতার যে ঘোষণা দেন, সেখানে দেশের মাটির কথা তিনি চরম বিপদের মুখে উচ্চারণ করেন নির্ভিক চিত্তে। স্মরণ করা যায় বঙ্গবন্ধুর সেই স্বাধীনতার ঘোষণা, ‘This may be my last message: From today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you may be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.’ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ছিল মজ্জাগত, মানবিক চেতনায় উচ্চকিত। তিনি ছিলেন বাঙ্গালীর ঐতিহাসিক সংস্কৃতির ধারক। তার কাছে সর্বদা প্রাধান্য পেয়েছে মানুষের মানবিক পরিচয়, এ কারণে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে ঐতিহ্য সংস্কৃতির ধারক বাঙ্গালীর জন্য অসম্মানের বলে মনে করতেন। বাংলাদেশ ও বাঙ্গালী স্বত্ত্বাকে তিনি কি বিপুল ভাবে ভালোবাসতেন, তা বোঝা যায় ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তিনি যে ভাষণ দেন তা থেকে। ঐ ভাষণে তিনি বলেছিলেন, আমার ছেলের পাশে আমার জন্য কবর খোড়া হয়েছিল- আমি ঠিক করেছিলাম, তাদের কাছে কোনদিন নতি স্বীকার করবো না, ফাসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলবো, আমি বাঙ্গালী, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা, জয় বাংলা। সেদিনের ভাষণেই সুস্পষ্ট উচ্চারিত হয়েছিল এই উদার মানব চেতনা, এই মহৎ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বন্ধুভাবাপন্ন মানসিকতার, আবার একই সংগে অন্যায়ের প্রতিবিধান তৈরি করা। তিনি বলেছিলেন ‘পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইয়েরা আপনাদের প্রতি আমার কোন বিদ্বেষ নেই, আপনারা সুখে থাকুন, আপনাদের সেনাবাহিনী আমাদের অসংখ্য লোককে হত্যা করেছে, তবুও আপনাদের প্রতি আমার আক্রোশ নেই, আপনারাও স্বাধীন থাকুন আমরাও স্বাধীন থাকি। বিশ্বের অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে আমাদের যে বন্ধুত্ব হতে পারে, আপনাদের সাথে শুধুমাত্র সেই বন্ধুত্বই হতে পারে। কিন্তু যারা অন্যায় ভাবে আমাদের মানুষকে মেরেছে তাদের অবশ্যই বিচার হবে’। শেষের বাক্যটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু সচেতনভাবে এখানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলেছেন। তার যজ্ঞের উত্তরাধিকারী, সুযোগ্য কন্যা, বাংলাদেশের উন্নতি আর অগ্রগতির স্বপ্নসারথি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় এবং সাহসী সিদ্ধান্তে বাংলার মাটিতে ’৭১ এর মানবতা বিরোধীদের বিচার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর সেই দিনের বক্তব্য আরও তাৎপর্য মন্ডিত হয়ে উঠে। কেবল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তিই নয় বাংলাদেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মুক্তি সংগ্রামে অন্যতম নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ধর্মীয় জাতিয়তাবাদের পরিবর্তে বঙ্গবন্ধুই প্রতিষ্ঠা করেন ভাষা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। তার সৃষ্ট জাতীয়তাবাদের ছায়াতলে মিশেছে সমগ্র বাঙ্গালী। বঙ্গবন্ধু আজীবন স্বপ্ন দেখতেন ক্ষুধা দারিদ্র মুক্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দ্রুত গতিতে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে- এগিয়ে যেতে হবে আরোও অনেক দূর। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাস্তবায়িত এবং শোষন মুক্ত অসাম্প্রদায়িক গনতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠন করতে হলে প্রকৃত দেশপ্রেম নিয়ে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে, সেটাই হবে জন্মশতবর্ষের বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক নিরপেক্ষ সংবাদ ও সাংবাদিক